বিশুদ্ধ ঈমান (পর্ব: ১)

আল্লাহ তার বেলায়াতের জন্য দুটি বিষয় উল্লেখ করেছেন: ঈমান ও তাকওয়া।

(১) তাওহীদের ঈমান

ঈমানের প্রথম  অংশ (লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ )  সাক্ষ্য প্রদান করা। ‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ উপাস্য, পূজ্য, ইবাদতকৃত বা মাবুদ । আরবী ভাষায় সকল পূজিত ব্যক্তি, বস্ত বা দ্রব্যকেই ‘ইলাহ’ বলা হয়। এজন্য সূর্যের আরেক নাম ‘ইলাহাহ’  বা ‘দেবী’; কারন কোন কোন সম্প্রদায় সূর্যের উপাসনা করত । 

আরবীতে ‘ইলাহাহ’ ও ‘ইবাদাহ’ শব্দদুটি সমার্থক । ‘ইবাদত’ অর্থ  চূড়ান্ত বিনম্রতা-ভক্তি | শব্দটি ‘আবদ’ বা ‘দাস’ থেকে গৃহীত । দাসত্ব বলতে উবূদিয়্যাত’ ও ‘ইবাদত’ দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়। উবূদিয়্যাত (slavery ) অর্থ লৌকিক বা জাগতিক দাসত্ব । আর ‘ইবাদত ‘( worship,veneration) অর্থ অলৌকিক, অজাগতিক বা অপার্থিব দাসত্ব । সকল যুগে সকল দেশের মানুষই জীবন, মৃত্যু ইত্যাদি অতিপরিচিত শব্দের মত “ইবাদত“, উপাসনা, worship, veneration ইত্যাদি শব্দের অর্থ স্বাভাবিকভাবেই বুঝে ।

মানুষ অন্য মানুষের দাসত্ব করতে পারে, তবে সে অন্য যে কোনো মানুষ বা সত্তার  ‘ইবাদত’ বা উপাসনা করে না। শুধু যার মধ্যে অলৌকিক বা অপার্থিব ক্ষমতা আছে, ইচ্ছা করলেই মঙ্গল করার বা অমঙ্গল করার বা তা রোধ করার অলৌকিক শক্তি বা অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করে তারই ‘ইবাদত’ করে ।

এভাবে আমরা দেখছি যে, ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু’ বাক্যটির অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ বা উপাস্য নেই। অর্থাৎ ইবাদত, উপাসনা, আরাধনা, চুড়ান্ত ভক্তি পাওয়ার যোগ্য উপাস্য বা মাবূদ একমাত্র তিনিই। এজন্য এ বিশ্বাসের নাম তাওহীদ বা একত্বের বিশ্বাস । এখানে উল্লেখ্য যে, কুরআন-হাদীসের আলোকে তাওহীদের ন্যুনতম দুটি পর্যায় রয়েছে: (১) জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদ ও (২) কর্ম পর্যায়ের তাওহীদ ।

প্রথম প্রকারের তাওহীদকে ‘তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ’ বা প্রতিপালনের একত্ব বলা হয়। এ পর্যায়ে মহান আল্লাহর কর্ম ও গুণাবলিতে তাকে এক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, আল্লাহই এ মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, পরিচালক, সংহারক, রিযিকদাত, পালনকর্তা, বিধানদাতা… ইত্যাদি | এ সকল কর্মে তার কোনো শরীক বা সমকক্ষ নেই ।

দ্বিতীয় প্রকারের তাওহীদকে ‘তাওহীদুল ইবাদাত’ বা ইবাদতের তাওহীদ বলা হয় | এ পর্যায়ে বান্দার কর্মে আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করা হয় । অর্থাৎ বান্দার সকল প্রকার ইবাদত: সাজদা, প্রার্থনা, যবাই, উৎসর্গ, মানত, তাওয়াক্কুল,ইত্যাদি একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য বলে বিশ্বাস করা ।

তাওহীদের এ দু’টি পর্যায় একে অপরের সম্পূরক | একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির উপর ঈমান এনে মুসলিম হওয়া যায় না। তবে ইসলামী বিশ্বাসে বা (লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ)-তে মূলত দ্বিতীয় পর্যায় বা “তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ্” এর সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। কারণ কুরআন ও হাদীসের বর্ণনানুসারে মক্কার কাফিরগণ এবং সকল যুগের কাফির-মুশরিকগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ’ বা প্রথম পর্যায়ের তাওহীদ বিশ্বাস করত।

 তারা একবাক্যে স্বীকার করত যে, আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা, তিনিই সর্বশক্তিমান এবং সকল কিছুর একমাত্র মালিক তিনিই।  এ বিশ্বাস নিয়ে তারা মহান আল্লাহর ইবাদত করত । তাকে সাজদা করত, তাঁর নামে মানত করত, তাঁর কাছে প্রার্থনা করত, সাহায্য চাইত, তাঁকে খুশি করতে হজ্জ, উমরা কুরবানী ইত্যাদি আমল করত | তবে তারা এর পাশাপাশি অন্যান্য দেবদেবী, নবী, ফিরিশতা, ওলী, পাথর, গাছগাছালি ইত্যাদির পূজা উপাসনা করত ।

আল্লাহ ছাড়া কোনো রাব্বুল আলামীন নেই, সর্বশক্তিমান নেই ইত্যাদি বিশ্বাস করলেও আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত বা ‘চূড়ান্ত ভক্তি’ করা যাবে না-এ কথাটি  তারা মানতনা | তাদের দাবি ছিল, কিছু মানুষ, জিন ও ফিরিশতা আছেন যারা মহান আল্লাহর খুবই প্রিয় । তাঁদের ডাকলে বা তাঁদের ভক্তি করলে আল্লাহ খুশি হন ও তার নৈকট্য, প্রেম ও সন্তষ্টি অর্জন করা যায়। এছাড়া তারা বিশ্বাস করত যে, এ সকল প্রিয় সৃষ্টির সুপারিশ আল্লাহ্‌ শুনেন । কাজেই এদের কাছে প্রার্থনা করলে এরা আল্লাহর নিকট থেকে সুপারিশ করে ভক্তের মনোবান্ঞ্ছনা পূর্ণ করে দেন ।

 এজন্য তারা এ সকল ফিরিশতা, জিন, মানুষ, নবী, ওলী বা কল্পিত ব্যক্তিত্বের মূর্তি, সমাধি, স্মৃতিবিজরিতবা নামজড়িত স্থান বা দ্রব্যকে সম্মান করত এবং সেখানে তাদের উদ্দেশ্যে সাজদা, মানত, কুরবানী ইত্যাদি করত ।

একারণে ইসলামে ‘ইবাদতের তাওহীদের’ উপর মূল গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে । মূলত এর মাধ্যমেই ঈমান ও শিরকের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয় । তাওহীদের উপর বিশ্বাসের ৬টি দিক রয়েছে, যেগুলোকে আরকানুল ঈমান বলা হয় । (১) আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, (২) আল্লাহর ফিরিশতাগণে বিশ্বাস, (৩) আল্লাহর গ্রন্থসমূহে বিশ্বাস, (8) আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসূলগণে বিশ্বাস, (৫) আখিরাতের বিশ্বাস, ৬) আল্লাহর জ্ঞান ও নির্ধারণ বা তাকদীরে বিশ্বাস |

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *