বিশুদ্ধ ঈমান (পর্ব:২)

রিসালাতের ঈমান

ঈমানের দ্বিতীয় অংশ (মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লা-হ) অথবা (মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু) অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সাঃ)- কে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করা । সংক্ষেপে একে “রিসালাত”-এর ঈমান বলা হয় ।  

(আব্দ) অর্থ বান্দা, ‘দাস বা ‘ক্রীতদাস’ । আরবীতে প্রতিটি মানুষকেই আল্লাহর আব্ দ বা বান্দা বলা হয়। এভাব আব্ দ অর্থই মানুষ এবং মাখলুক বা সৃষ্ট । পূর্ববর্তী নবীগণের উম্মাতদের ঈমান বিনষ্ট হয়ে শিরকে নিপতিত হওয়ার মূল কারণ ছিল নবীগণ বা ওলীগণের বিষয়ে অতিভক্তি করা, তাদেরকে আল্লাহ সত্তা বা যাতের অংশ, প্রকাশ, আল্লাহর সাথে একীভূত বা ফানা ও বাকা প্রাপ্ত, ইলাহী বা ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী ইত্যাদি মনে করা ।

সর্বশেষ উম্মাতকে এ সকল শিরক থেকে রক্ষা করার জন্য মুহাম্মাদ (সাঃ) -এর রিসালাতের বিশ্বাসের সাথে তাঁর ‘আবদিয়্যাত’-এর বিশ্বাসকে অবিচ্ছেদ্যভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আল্লাহর রাসূল, তবে তিনি তার বান্দা (দাস), মাখলুক (সৃষ্ট) ও মানুষ । তিনি কোনোভাবেই আল্লাহর যাত (সত্তা) বা সিফাত (বিশেষণ)-এর অংশ বা প্রকাশ নন। মহান আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা, মালিক ও উপাস্য । মুহাম্মাদ ( সাঃ)  তার মাখলুক (সৃষ্ট), বান্দা (দাস) ও উপাসক রাসূল ।

(রাসূল) অর্থ বার্তাবাহক (messenger)।  আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান, বিবেক, স্বাধীন ইচ্ছা ও বিচার শক্তি দান করেছেন; যেন মানুষ ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণ করে ন্যায় ও ভালর পথে চলে এবং মন্দ ও অন্যায়ের পথ থেকে নিজেকে দূরে রাখে । উপরন্তু মানুষকে ন্যায়ের পথের সন্ধান ও তাকওয়ার বাস্তব মডেল দেওয়ার জন্য আল্লাহ যুগে যুগে প্রত্যেক জাতি, সমাজ বা জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে কিছু মানুষকে মনোনীত করে তাদের কাছে ওহী বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে তার বাণী ও নির্দেশ প্রেরণ করেছেন। যেন তারা মানুষদেরকে তা শিক্ষা দান করেন এবং নিজেদের জীবনে তার বাস্তব ও পরিপূর্ণ প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের সামনে বাস্তব আদর্শ তুলে ধরেন । এদেরকে ইসলামের পরিভাষায় নবী ও রাসূল বলা হয় ।

কুরআন ও হাদীসের বিস্তারিত দিকনির্দেশনার আলোকে মুহাম্মাদ   (সাঃ) -কে আল্লাহর রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করার অর্থ অতি-সংক্ষেপে নিম্নরূপ:

১. মুহাম্মাদ( সাঃ)  আল্লাহর মনোনীত নবী ও রাসূল। মানবজাতির মুক্তির পথের নির্দেশনা দানের জন্য তাদের ইহলৌকিক সকল কল্যাণ ও অকল্যাণের পথ শিক্ষা দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেন । মানবজাতির মুক্তির পথ, কল্যাণ ও অকল্যাণের সকল বিষয় আল্লাহ তাকে জানিয়েছেন এবং তা মানুষদেরকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব তাঁকে দান করেছেন ।

২. তিনি আল্লাহর মনোনীত সর্বশেষ নবী ও রাসূল, তার পরে আর কোনো ওহী নাধিল হবে না, কোনো নবী বা রাসূল আসবেন না ।

৩. মুহাম্মাদ( সাঃ)বিশ্বের সকল দেশের সকল কালের সকল জাতির সব মানুষের জন্য আল্লাহর মনোনীত রাসূল ৷ তাঁর আগমনের দ্বারা পূর্ববর্তী সকল ধর্ম রহিত হয়েছে। তাঁর রিসালাতে বিশ্বাস ছাড়া কোনো মানুষই মুক্তির দিশা পাবে না ।

৪. মুহাম্মাদ (সাঃ)  পরিপূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথে তাঁর নবুয়তের ও রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন । আল্লাহর সকল বাণী, শিক্ষা ও নির্দেশ তিনি পরিপূর্ণভাবে তাঁর উন্মাতকে শিখিয়ে গিয়েছেন, কোন কিছুই তিনি গোপন করেননি ।

৫, মুহাম্মাদ( সাঃ)  যা কিছু উম্মাতকে জানিয়েছেন সবকিছুই তিনি সত্য বলেছেন । তাঁর সকল শিক্ষা, সকল কথা সন্দেহাতীতভাবে সত্য ।

৬. আল্লাহকে ডাকতে, উপাসনা করতে, তাঁর নৈকট্য বা সন্তুষ্টি অর্জন করতে অবশ্যই মুহাম্মাদ (সাঃ) -এর শিক্ষা অনুসরণ করতে হবে । তার শিক্ষার বাইরে ইবাদত করলে তা কখনো আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না ।

৭. জীবনের সকল ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে তাঁর আনুগত্য করা । জীবনের সকল বিষয়ে তাঁর শিক্ষা, বিধান ও নির্দেশ দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেওয়া । সকল মানুষের কথা ও সকল মতের ঊধ্বে তাঁর শিক্ষা ও কথাকে স্থান দেওয়া ।

৮. তাঁর শিক্ষা অনুসারে সকল মতবিরোধের নিষ্পত্তি করা । মুসলমানদের মধ্যে মতবিরোধ ঘটলে ফয়সালার জন্য তাঁর শিক্ষার, অর্থাৎ কুরআন ও হাদীসের শিক্ষার আশ্রয় নিতে হবে । কুরআনের বা হাদীসে নির্দেশনা সর্বান্তঃকরণে মেনে নিতে হবে । তাঁর মতকে সকল মতের ঊধ্বে স্থান দিতে হবে ।

৯. জীবনের সকল পর্যায়ে তাঁর অনুসরণ ও অনুকরণ করা এবং তার সুনাত (জীবনপদ্ধতি) অনুসারে নিজেকে পরিচালিত করা । তাঁর সুন্নাত বা জীবনাদর্শই  মুসলিমের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ বলে সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা ।

১০. মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে সর্বোচ্চ সম্মান করা । এ কথা বিশ্বীস করা যে, তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, মানবজাতির নেতা, নবী-রাসূলদের প্রধান ৷তিনি আল্লাহর প্রিয়তম বান্দা, তাঁর হাবীব, তাঁর সবচেয়ে  সম্মানিত বান্দা, সর্বযুগের সকল  মানুষের নেতা । তিনি নিস্পাপ । নবুয়তপ্রাপ্তির আগে ও নবুয়াতের পরে সর্ব অবস্থায় আল্লাহ তাঁকে সকল পাপ, অন্যায় ও অপরাধ থেকে রক্ষা করেছেন । প্রথম মানব আদম (আ)-এর সৃষ্টির সময়েই আল্লাহ তাঁর জন্য নবুয়ত নির্ধারণ করে রাখেন এবং তাকে সর্বশেষ নবী হিসেবে মনোনীত করেন ।

১১. মুহাম্মাদ (সাঃ) -এর মর্যাদা ও সম্মানের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসের উপর নির্ভর করা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ-)এর প্রতি বিশ্বাস সম্মান ঈমানের মৌলিক বিষয় এবং ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলি প্রত্যেক মানুষের জন্য দ্ব্যর্থহীন ও সহজবোধ্যভাবে বর্ণনা করাই ওহীর মূল কাজ । এখানে ঘোরপ্যাঁচ, ব্যাখ্যা ও ইজতিহাদের অবকাশ রাখার অর্থ ঈমান ও নাজাতকে কঠিন করা ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *