বিশুদ্ধ ঈমান (পর্ব: ৩)

এজন্য কুরআন-হাদীসে তাঁর সম্মান, মর্যাদা, দায়িত্ব, ক্ষমতা ইত্যাদি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। মুসলিমের দায়িত্ব তাঁর  বিষয়ে কুরআন কারীম বা  সহীহ হাদীসে যা বলা হয়েছে তা পরিপূর্ণভাবে বাহ্যিক ও সহজ অর্থে সর্বান্তঃ করণে বিশ্বাস করা । নিজের থেকে কোন কিছু বাড়িয়ে বলা যাবে না, কারণ তা আমাদেরকে মিথ্যা ও বাড়াবাড়ির পথে ঠেলে দেবে, যা কুরআন ও হাদীসে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে । এ জাতীয় কয়েকটি গুরুত্পূর্ণ বিষয়:

. কুরআন কারীম ও সহীহ হাদীসের আলোকে একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, সকল মর্যাদা ও সম্মান সহ তিনি আল্লাহর একজন বান্দা (দাস) ও একজন মানুষ । সৃষ্টির উপাদানে, মানবীয় প্রকৃতি ও স্বভাবে তিনি একজন মানুষ । তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ । তাঁর মূল বৈশিষ্ট্য তাঁর মহান কর্মে, তার মহোত্তম চরিত্রে ৷ উপাদানে, সৃষ্টিতে ও প্রকৃতিতে অন্য সবার মত হয়েও তিনি সকল  মানবীয় দুবর্লতা জয় করে ছিলেন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি,ভালোবাসা, আস্থা,ইবাদত, বিধান পালন, ন্যায়বিচার, সেবা ইত্যাদি সকল দিকে মানবতার পূর্ণতম নিদর্শন ও আদর্শ ছিলেন তিনি | এটিই ছিল তাঁর অন্যতম মু’জিযা। তিনি মানবতার পূর্ণতার শিখরে উঠেছিলেন, তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ।

এগুলির পাশাপাশি মহান আল্লাহ তাঁকে অতিরিক্ত কিছু বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন, যেগুলি কোন মানুষকে দেননি | যেমন সাধারণ মানুষের মত তাঁর ঘামে কোন দুর্গন্ধ ছিলনা, বরং তার শরীরের ঘাম ছিল অত্যন্ত সুগন্ধ ৷ তাঁর ঘুম  সাধারণ মানুষের মতো ছিল না; তিনি ঘুমালেও আর তাঁর অন্তর সজাগ ও সচেতন থাকত । তিনি সালাতের মধ্যে তাঁর পিছন দিকেও দেখতে পেতেন । অনুরূপ যত বৈশিষ্ট্য সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে সবই মুমিন কোনরূপ অপব্যাখ্যা, বাড়াবাড়ি, তুলনা বা সন্দেহ ছাড়া বিশ্বাস করেন।

. আল্লাহ তাঁকে দুনিয়া ও আখিরাতের অতীত-ভবিষ্যৎ অনেক কিছু জানিয়েছিলেন । সাধারণ মানুষের জ্ঞানের ঊর্ধ্বে  অনেক গোপনীয় ও ভবিষ্যতের জ্ঞান তাঁকে আল্লাহ দান করেন । সাথে সাথে কুরআন ও হাদীসে বারবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, সার্বিক গাইৰ ও ভবিষ্যতের কথা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। আল্লাহর জানানো বিষয় ছাড়া কোন ভবিষ্যৎ কথা, মনের গোপন কথা, বর্তমানের লুক্কায়িত কথা, গোপনকৃত তথ্য ইত্যাদি তিনি জানতেন না বলে তিনি আমাদেরকে কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে বারবার জানিয়েছেন । আমরা তাঁর সকল কথা সরলভাবে বিশ্বাস করি । এক আয়াত দ্বারা আরেক আয়াতকে বা এক হাদীস দ্বারা অন্য হাদীসকে বাতিল বা অপব্যাখ্যা করি না, কোন একটির জন্য বাড়াবাড়ি করি না বা অতিভক্তি করি না । আল্লাহ ও তাঁর রাসূল( সাঃ)-এর সকল কথা সরলভাবে হুবহু মেনে নেওয়াই সর্বোচ্চ  ভক্তি ।

. আল্লাহর আব্দ (দাস) ও রাসুল হিসাবে তাঁকে আল্লাহ মানবজাতিকে সতর্ক করা ও সুসংবাদ প্রদান করার দায়িত্ব দান করেন । বিশ্ব জগতের পরিচালনা, কারো মঙ্গল বা অমঙ্গল করার দায়িত্ব বা ক্ষমতা আল্লাহ তাঁকে দেননি | তাঁকে আল্লাহ অনেক মুজিযা বা অলৌকিক নিদর্শন দান করেছেন । তার দু’আ য় আল্লাহ অগণিত অলৌকিক কর্ম সম্পন্ন করেছেন । এসকল আয়াত (অলৌকিক নিদর্শন) বা মুজিযা সবই আল্লাহর ইচ্ছায় ও ক্ষমতায় সংঘটিত হয়েছে । তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন, আর দু’আ কবুল করা বা না করা পুরোপুরিই আল্লাহর এখতিয়ার । তিনি আল্লাহর প্রিয়তম বান্দা । তার অনেক দুআ আল্লাহ কবুল করেছেন । আবার কখনো কখনো কবুল করেননি । তিনি বদদু’আ করলে আল্লাহ তাঁকে নিষেধ করেছেন । তাঁর দু’আ য় আল্লাহ অসংখ্য মানুষের গোনাহ মাফ করেছেন । আল্লাহর অনুমতিতে তিনি শাফায়াত করবেন এবং তাঁর শাফায়াতে অসংখ্য পাপী মুসলিমকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন ৷ তবে তাঁর দু’আ ও শাফায়াত কবুল করা আল্লাহর ইচ্ছা । আল্লাহর রহমত ও তাঁর রাসূলের দুআর কল্যাণ পাওয়ার যোগ্য কে তা আল্লাহ জাল্লা জালালুহু-ই ভাল জানেন ।

. তিনি অন্যান্য সকল মানুষের মত মরণশীল | তিনি যথা সময়ে মৃত্যু বরণ করেছেন । হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁকে মৃত্যুর পরে বিশেষ বারযাখী হায়াত বা জীবন দিবেন যাতে তিনি নামায পড়বেন, উম্মাতের দরুদ সালাম ফিরিশতাগণ তাঁর কাছে পৌছাবেন, তিনি জবাব দিবেন ও দু’আ করবেন । হাদীসে বর্ণিত এসকল বিষয় আমরা সরলভাবে বিশ্বাস করি । এগুলির উপর নির্ভর করে বাড়িয়ে অন্য কিছু বলি না । আমরা বলি না যে, যেহেতু তাঁর বিশেষ জীবন আছে, সেহেতু তিনি খাওয়া-দাওয়া করেন, অথবা ঘুরে বেড়ান, ইত্যাদি । তিনি আমাদের যতটুকু জানার প্রয়োজন তা জানিয়ে দিয়েছেন, তার বেশি বলার অর্থ তার নামে আন্দাযে মিথ্যা কথা বলা, যা কঠিনতম পাপ ও জাহান্নামের কারণ ।

. তিনি নিজে তাঁর বিষয়ে বাড়াবাড়ি অপছন্দ করতেন | তিনি বলেন:” তোমরা আমার প্রশংসায় -ভক্তিতে বারাবাড়ি করবেনা, যেমনভাবে খ্রিষ্টানরা ঈসা (আ)-কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছিল । আমি তো একজন বান্দা (দাস) মাত্র, কাজেই তোমরা বলবে: আল্লাহর দাস (বান্দা) ও রাসূল ৷” একদা এক ব্যক্তি তাঁকে বলেন: ‘আল্লাহর মর্জিতে এবং আপনার মর্জিতে ..।”  তিনি তাকে ধমক দিয়ে বলেন: “তুমি আমাকে আল্লাহর সমতুল্য বানিয়ে দিচ্ছ? বরং একমাত্র আল্লাহর মর্জিতেই”।

এক ব্যক্তি বলে: ‘ইয়া মুহাম্মাদ, ইয়া সাইয়েদানা, ইবনা সাইইেদনা,খাইরানা ইবনা খাইরিনা: হে মুহাম্মাদ,হে আমাদের নেতা, আমাদের নেতার পুত্র, আমাদের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি ও শ্রেষ্ঠ মানুষের সন্তান ‘। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: “হে মানুষেরা, তোমরা তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) অবলম্বন কর। শয়তান যেন তোমাদেরকে বিপথগামী না করে । আমি মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ: আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ, আল্লাহ্‌র বান্দা (দাস-চাকর) ও রাসূল । আল্লাহর কসম! আল্লাহ জাল্লা শানুহু আমাকে যে স্থানে রেখেছেন, যে মর্যাদা প্রদান করেছেন তোমরা আমাকে তার উপরে উঠাবে তা আমি পছন্দ করি না।

১২. “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ মুহাম্মাদ (সাঃ)কে সকল মানুষের ঊর্ধ্বে  নিজের সম্পদ, সন্তান, পিতামাতা ও নিজের জীবনের চেয়ে অধিক ভালবাসা । তাঁর মহান সাহাবীগণ ও তাঁর আত্মীয় স্বজনকে ভালবাসা ও শ্রদ্ধা করা তাঁর ভালবাসার অবিচ্ছেদ্য অংশ । রাসূলুল্লাহ( সাঃ)-এর ভালবাসা মুখের দাবীর ব্যাপার নয়। তাঁর নির্দেশিত পথে চলা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে  চলা, তাঁর শরীয়তকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পালন করা এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকাই তাঁর মহব্বতের প্রকাশ । তাঁর আনুগত্য, অনুসরণ ও শরীয়ত পালন ব্যতিরেকে যদি কেউ তাঁর ভালবাসার দাবি করেন তবে তিনি মিথ্যাবাদী অথবা তিনি আবূ তালিব-এর মত তাঁকে ভালবাসেন । এরূপ ভালবাসা মুক্তির পথ নয় ।

প্রেম বা ভালবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ কোনোভাবে ‘প্রেমকৃতকে’ কষ্ট না দেওয়া; প্রাণপণে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা। এজন্য প্রকৃত ভালবাসা পরিপূর্ণ আনুগত্য ও অনুকরণে ধাবিত করে । আর আনুগত্য ও অনুকরণ ভালবাসাকে গভীর থেকে গতীরতর করে। যিনি যত বেশী তাঁর শরীয়তকে মেনে চলবেন এবং তাঁর সুন্নাত মত জীবন যাপন করবেন, তাঁর ভালবাসা তত বেশী অর্জন করবেন । সাহাবী-তাবিয়ীগণ ও বুজুর্গগণ কর্ম ও অনুসরণের মাধ্যমেই তাঁকে ভালবেসেছেন । এভাবেই মুসলিমের অন্তরে তারঁ প্রতি ভালোবাসা গভীর  হতে থাকে, তখন জীবনের সবকিছুর ঊধ্বে, সকল মানুষের ঊধ্বে, এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও তাকে ভালবাসতে  সক্ষম হয় একজন মুসলিম । আমার আল্লাহর দরবারে সকাতরে প্রার্থনা করি, তিনি যেন

আমাদেরকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রকৃত অনুসরণের ও প্রকৃত ভালবাসার তাওফীক দান করেন। আমীন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *